ছোট্ট এক শহরের গলির শেষ মাথায় থাকতেন রোজিনা বেগম। কথায় ছিলো তীক্ষ্ণ ধার, মনে ছিলো দৃঢ়তা কিন্তু সেই দৃঢ়তার আড়ালে ছিল একরোখা একটা মনোভাব। সংসারের ছোট বড় সব ঘটনায় নিজের মতই চূড়ান্ত বলে বিশ্বাস করতেন তিনি।
![]() |
| চালাক মা, তালাক কন্যা |
তার একমাত্র মেয়ে সানজিদা - রূপে যেন ফুটন্ত শাপলা, শিক্ষায়ও প্রশংসনীয়। কিন্তু মায়ের দীর্ঘদিনের শিক্ষা তাকে বানিয়েছিল আত্মবিশ্বাসে অতি-অহংকারী। রোজিনা প্রায়ই বলতেন, "মেয়েমানুষ যদি চুপ করে থাকে, সবাই তাকে দুর্বল ভাবে। কেউ কষ্ট দিলে সাথে সাথে জবাব দিবি। বিন্দুমাত্র ছাড় দিবি না।"
এই কথাগুলো যেন সানজিদার জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়াল। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে প্রথম দিনেই সে বুঝিয়ে দিল, এখানে সে চুপচাপ থাকবে না। স্বামী রাশেদ - নম্র, কর্মঠ, কিন্তু অল্পভাষী মানুষ। শ্বশুর-শাশুড়িও ছিলেন শান্ত স্বভাবের। কিন্তু সানজিদার চোখে সামান্য ত্রুটিও যেন পাহাড়সম অপরাধ।
একদিন ডাল একটু পাতলা - রাগে হাঁড়ি উল্টে দিল। আরেকদিন স্বামী অফিস থেকে দেরি করে ফিরলে দরজাই খুলল না। তার আচরণে যেন স্পষ্ট - এই সংসার তার শর্তেই চলবে।
রাশেদ ধৈর্যের বাঁধ ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কথায় কথায় ঝগড়া, নীরবতায় অবমাননা - দুয়ের চাপে সংসারের নৌকা ডুবে গেল। কয়েক মাসের মধ্যেই এল তালাকের কাগজ। রোজিনা বেগম তখনও মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "তুই ঠিকই ছিলি, তারা তোকে বোঝেনি।"
এরপর দ্বিতীয় বিয়ে - নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা। কিন্তু বদলালো না সানজিদার আচরণ। আবারও বিচ্ছেদ। তৃতীয় বিয়েতেও একই পরিণতি - সবাই যেন একে একে তার জীবন থেকে বিদায় নিল। বারবার ভাঙনের পর একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল সানজিদা। চোখে জমেছে অনুশোচনার ছায়া, ঠোঁট কাঁপছে অপ্রকাশিত প্রশ্নে– "সব দোষ কি সত্যিই ওদের ছিল? নাকি ভালোবাসার চেয়ে তর্ক, ধৈর্যের চেয়ে অহংকার, নম্রতার চেয়ে চালাকি বেছে নেওয়াটাই ছিল আমার ভুল?"
গল্প থেকে শিক্ষনীয়: চালাকি ক্ষণিকের জয় দেয়, কিন্তু সহনশীলতা দেয় দীর্ঘস্থায়ী সুখ। অহংকার দিয়ে দাম্পত্যের দরজা খোলা যায় না, যায় মমতা, শ্রদ্ধা আর বোঝাপড়া দিয়ে। মায়ের অতিরিক্ত চাতুর্য যদি মেয়ের জীবনে অহংকারের বিষ ঢেলে দেয়, তবে প্রেমের বাগান শুকিয়ে গিয়ে ফেলে যায় কেবল তালাকের শুষ্ক কাগজ।

0 মন্তব্যসমূহ